বাংলাদেশ আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অস্থির, উত্তেজনাপূর্ণও তেমনি সতর্কতারও দাবি রাখে। এ মুহূর্তে নাগরিকরা শুধু ক্ষমতা বা সুবিধার জন্য নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্য সঠিক নেতৃত্ব বেছে নিতে চায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই ভোট কি শুধুই ক্ষমতার লোভ, নিকটতম সুবিধা বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অর্জনের হাতিয়ার, নাকি এটি আমাদের ধর্মীয় ও নাগরিক দায়িত্বেরও অংশ?
১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার হলো নাগরিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রায়ই ক্ষমতার লোভ, পারিবারিক রাজনীতি, প্রতারণা ও অর্থ-প্রভাবের খেলায় সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক ভোটারের কাছে নির্বাচনের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প-রাস্তা, সেতু, ব্রিজ-যা প্রার্থীর যোগ্যতা বা নৈতিকতার মানদণ্ড নয়।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ভোটের গুরুত্ব শুধুই সাময়িক সুবিধা বা ক্ষমতার লোভে সীমাবদ্ধ নয়। হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) বলেছেন, ভোট হলো তিনটি দিকের সমষ্টি: সাক্ষ্য প্রদান, সুপারিশ এবং প্রতিনিধিত্বের অথরিটি প্রদান। কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত করা মানে আমরা তাকে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে অনুমোদন দিচ্ছি এবং তার কার্যকলাপে আমাদেরও অংশ রয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহতে সুপারিশ এবং সাক্ষ্যের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ আছে। যেমন সূরা নিসা (৮৫) এ বলা হয়েছে, যে ভালো সুপারিশ করবে সে তার নেকীর ভাগী হবে, আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সে মন্দের অংশীদার হবে।
ভোটের সবচেয়ে মৌলিক দিক হলো সাক্ষ্য প্রদান। কাউকে ভোট দেওয়া মানে তার যোগ্যতা ও নৈতিকতার ওপর সাক্ষ্য প্রদান করা। মিথ্যা সাক্ষ্য ইসলামে গুরুতর পাপ, যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের ওপরও ক্ষতি বিস্তার করে। অযোগ্য বা অপ্রয়োজনীয় প্রার্থীকে সমর্থন করা সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসৎ নেতৃত্বের উত্থান নিশ্চিত করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক উত্তাপ, সামাজিক অস্থিরতা এবং নেতাদের চরিত্রগত দুর্বলতা স্পষ্ট। তবে এর মানে এই নয় যে ভোট থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, যে প্রার্থী তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকারক, তার পক্ষে ভোট দেওয়া যায়। অর্থাৎ, বেশি ক্ষতি এড়াতে বিবেচনা ও বুদ্ধি ব্যবহার করে ভোট প্রদান করা নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
জনমনে সচেতনতার বৃদ্ধি লক্ষ্যনীয়। মানুষ এখন পুরনো রাজনৈতিক দলে নয়, নৈতিক ও যোগ্য নেতৃত্বের দিকে নজর দিচ্ছে। নির্বাচনের সময় প্রার্থীর চরিত্র, নীতি, জনগণের কল্যাণে অঙ্গীকার এবং দেশের স্বার্থে তার অবস্থান যাচাই করা ভোটারের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
মোটকথা, ভোট শুধুই ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়। এটি হলো সাক্ষ্য, সুপারিশ এবং রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-একটি সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দেশের স্বার্থনির্বাহী নেতৃত্ব নির্বাচন করা, যাতে বাংলাদেশ শান্তি, কল্যাণ ও প্রগতি অর্জন করতে পারে। ভোট থেকে বিরত থাকা সমীচীন নয়; বরং বুদ্ধি-বিবেচনা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মানদণ্ডকে সামনে রেখে ভোট প্রদান সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।
পবিত্র কুরআন মিথ্যা সাক্ষ্যকে হারাম ঘোষণা করেছে এবং সত্য সাক্ষ্যকে জরুরি ও আবশ্যক বলে নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ বলেন: তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্য দান করো।” (নিসা: ১৩৫) তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।” (মায়িদা: ৮)
সুরা তালায় ইরশাদ হয়েছে: “তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দেবে।” (তালাক: ২)
আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে: “তোমরা সাক্ষ্য গোপন করবে না; আর যে তা করবে তার অন্তর পাপরাশিতে বিষাক্ত হয়ে পড়বে।” (বাকারা: ২৮৩)
অর্থাৎ, সত্য সাক্ষ্য না দেওয়া বা তা গোপন করা হারাম এবং এতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়াও হারাম। মুসলমানদের জন্য সত্য সাক্ষ্য প্রদান ফরজ, এবং ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের সময় এটি প্রয়োগ করা নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।
যদি কোনো আসনে পুরোপুরি সৎ প্রার্থী না পাওয়া যায়, তবে যিনি তুলনামূলকভাবে কম অপকর্ম করবেন এবং সততা ও নৈতিকতায় কিছুটা অগ্রগামী, তাকে ভোট দেওয়া বৈধ ও উত্তম। এর মাধ্যমে মন্দ কমানো ও জুলুম-নির্যাতন কমাতে চেষ্টা করা যায়, যা শরিয়তেরও একটি নীতি।
সংক্ষেপে:
১। আপনার ভোট ও সাক্ষ্যদানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদক্ষেপের দায়দায়িত্বও আপনার ওপর বর্তায়।
২। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ভোটের প্রভাব ব্যক্তিগত ভুলের তুলনায় অনেক বড়।
৩। টাকা-পয়সার বিনিময়ে ভোট দেওয়া ইসলামবিরুদ্ধ ও রাষ্ট্রবিরোধী।
মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন: ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, যে অপরের দুনিয়া অর্জনের স্বার্থে নিজের ধর্ম বিকিয়ে দিল।
সুতরাং ভোটের মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব হলো শুধু নেতা নির্বাচন নয়, সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক মানকে প্রমাণ করা। আসুন সচেতন হয়ে ভোটের মর্যাদা ফিরিয়ে দিই এবং দেশের জন্য সঠিক ও ন্যায়পরায়ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা