ইউরোপজুড়ে শিশু ও কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ফ্রান্সের পর এবার একই পথে হাঁটতে যাচ্ছে স্পেন ও গ্রিস। প্রস্তাবিত এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হলে ১৫ বা ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না, যা ইউরোপের ডিজিটাল নীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারগুলোর যুক্তি একটাই, সোশ্যাল মিডিয়া শুধু সময় নষ্টই করছে না, বরং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত বিকাশ এবং সামাজিক দক্ষতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্পেন
স্পেন ইতোমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। দেশটিতে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ নাগরিকই এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। এত বড় জনসমর্থন ইউরোপে তুলনামূলকভাবে বিরল এবং এটি স্প্যানিশ সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জুগিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার সরকার এমন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে, যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ালে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের শীর্ষ নির্বাহীদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ব্যবহারকারীদের নয়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও সরাসরি চাপের মুখে ফেলবে।
গ্রিস
একই ধরনের সিদ্ধান্তের পথে রয়েছে গ্রিস। দেশটির সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ঘোষণা শিগগিরই আসতে পারে। গ্রিসের ডিজিটাল গভর্নেন্স মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বলে জানানো হলেও, নির্দিষ্ট সময় এখনো ঘোষণা করা হয়নি। গ্রিস সরকার মনে করছে, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে সামাজিক ও মানসিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ইউরোপে আগেই শুরু হয়েছে কড়াকড়ি
স্পেন ও গ্রিসের আগেই ফ্রান্স গত মাসে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করে একটি বিল পাস করেছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ভোট দেয়, যদিও সেখানে এখনো চূড়ান্ত আইন কার্যকর হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপ এখন শিশুদের ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
বিশ্বে প্রথম অস্ট্রেলিয়া
এই বৈশ্বিক প্রবণতার সূচনা করে অস্ট্রেলিয়া। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশটি বিশ্বে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে। সেই সিদ্ধান্তই মূলত ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
যে কারণে এত উদ্বেগ
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে, শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আত্মসম্মানবোধে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, অনলাইন বুলিং, যৌন হয়রানি ও সহিংস কনটেন্টের ঝুঁকি বাড়ছে এবং ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে অ্যালগরিদমভিত্তিক কনটেন্ট শিশুদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগও দীর্ঘদিনের।