৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইউরোপ

নেদারল্যান্ডসে মুসলিমদের উপর বছরের পর বছর ধরে চালানো হয়েছে গোপন নজরদারি: এপি

নেদারল্যান্ডসে মুসলিমদের উপর বছরের পর বছর ধরে চালানো হয়েছে গোপন নজরদারি: এপি

নেদারল্যান্ডসে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বছরের পর বছর ধরে গোপন নজরদারি চালানোর অভিযোগে দেশটির ১০টি পৌরসভাকে জরিমানা করেছে জাতীয় তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা ইউরোপে মুসলিমদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং বৈষম্যমূলক নীতির প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

নেদারল্যান্ডসের তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ(এপি)–এর এক দীর্ঘ তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি পৌরসভা মুসলিম নাগরিকদের ওপর গোপন ও অবৈধ নজরদারি চালিয়েছে। এসব পৌরসভা তথাকথিত “চরমপন্থা প্রতিরোধ” কর্মসূচির আওতায় মুসলিম ব্যক্তি, মসজিদ ও ইসলামি সংগঠন সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে। এই নজরদারি কর্মসূচির আওতায় মুসলিমদের, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতামত, সামাজিক সম্পর্ক, মসজিদে যাতায়াত ও কার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, এসব তথ্য গোপনে নথিভুক্ত করা হয়, যা ইউরোপীয় গোপনীয়তা আইন অনুযায়ী চরমভাবে বেআইনি।

এই গুরুতর আইন লঙ্ঘনের দায়ে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিটি পাউরসভাকে ২৫ হাজার ইউরো করে জরিমানা দিতে হবে। জরিমানাপ্রাপ্ত পৌরসভাগুলো হলো-ডেলফট, আইন্ডহোভেন,টিলবার্গ, হার্লেমারমির, হিলভারসুম, হুইজেন, গুইসে মেরেন, ভেনেনডাল, জুটারমিয়ার এবং এডে।
পৌরসভাগুলো সরাসরি নজরদারি না করে বেসরকারি গবেষণা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়। এসব সংস্থা, মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ, ইসলামি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, এরপর এই তথ্য পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করা হতো। অথচ যাদের ওপর নজরদারি চলছিল, তারা কিছুই জানতেন না। নেদারল্যান্ডসের তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানায়,

“ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা সবচেয়ে সংবেদনশীল ডেটার মধ্যে পড়ে। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের জন্য শক্ত আইনি ভিত্তি প্রয়োজন, যা এখানে ছিল না।”

এপি–এর চেয়ারম্যান আলেইড উলফসেন বলেন,

“শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে কাউকে নজরদারির আওতায় আনা বৈষম্যমূলক এবং আইনবিরোধী।”

নেদারল্যান্ডসের মুসলিম সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে, রাষ্ট্রীয় ইসলামোফোবিয়া, ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অনেক মুসলিম নাগরিক বলেছেন, তারা নিজেদের দেশে থেকেও “সন্দেহভাজন নাগরিক” হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

কিছু পৌরসভা, বিশেষ করে ডেলফট, প্রকাশ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তারা স্বীকার করেছে যে এটা নীতিগত ভুল হয়েছে, মুসলিমদের আস্থা ভেঙেছে। তবে মুসলিম নেতারা বলছেন, শুধু ক্ষমা যথেষ্ট নয়, এ ধরনের নজরদারি ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে, তার নিশ্চয়তা চাই।
এই ঘটনা ইউরোপজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে, নিরাপত্তার নামে কি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নজরদারি চালানো যায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুসলিমদের ওপর এমন নজরদারি উগ্রবাদ কমানোর বদলে বরং, সামাজিক বিভাজন বাড়ায়, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমায় এবং মুসলিমদের আরও প্রান্তিক করে তোলে।

নেদারল্যান্ডসের এই ঘটনা শুধু একটি দেশের বিষয় নয়—এটি ইউরোপে মুসলিমদের অবস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করে, তাহলে তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।