আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে নারী দিবস হিসেবে। পৃথিবীর কোনো অংশে এটি উদযাপনের দিন, কোথাও আবার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে স্মরণ করার দিন। মূলত দিবসটির পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। বহু দেশে তাই এটি আন্তর্জাতিক নারী শ্রমিক দিবস হিসেবেও পরিচিত।
এ বছর ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন-নারী ও কন্যার উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। নারী অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্ন আজ আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও কর্মসূচির মাধ্যমে নারী অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে অজ্ঞতাবশত অনেকেই নারীর অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন।
বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পবিত্র কুরআনে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় পুরুষকে দায়িত্ব ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসলামের আবির্ভাবের আগে নারীর মর্যাদা ছিল অত্যন্ত অবমাননাকর। সমাজে তাদের অধিকার বলতে কার্যত কিছুই ছিল না। কিন্তু মানবতার মুক্তির দূত নবিকুল শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে নারীরা তাদের যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে।
ইসলামের মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ‘নিসা’ অর্থাৎ ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটি ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ‘নিসা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র বৃহৎ সূরাও রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর মর্যাদা, অধিকার এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নারীর অধিকারের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, “নারীদের (পুরুষদের উপর) তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন রয়েছে নারীদের উপর পুরুষদের।” (সুরা আল-বাকারা: ২২৮)
এই আয়াত নারীর অধিকার সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। ইসলাম নারীকে দিয়েছে জান-মালের নিরাপত্তা, সম্মান এবং সামাজিক মর্যাদা।
নারীদের প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে মহানবী (সা.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে হজরত হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া (রা.) তার পিতা মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন-স্বামীর ওপর স্ত্রীর কী কী অধিকার রয়েছে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তুমি যখন খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যে মানের পোশাক পরবে তাকেও সে মানের পোশাক পরাবে। তার মুখে আঘাত করবে না এবং অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করবে না।” (আবু দাউদ)
এটাই ছিল ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা মুসলমান এবং শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হওয়ার দাবি করলেও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও আদর্শ আমাদের সমাজে সবসময় প্রতিফলিত হয় না।
ইসলাম নারীকে শুধু সম্মানই দেয়নি, দিয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক অধিকারও। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন,
“তিনি তোমাদের একই সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবনসঙ্গিনীকে সেই একই উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা নিসা: ১)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে-সে পুরুষ হোক বা নারী-সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সুরা মুমিন: ৪০)
অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে নর-নারী উভয়ই আশরাফুল মাখলুকাত এবং কর্মফলের বিচারে উভয়েরই সমান মর্যাদা রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে ইসলাম নারীকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। যেমন মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।” সন্তানের কাছে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মাকে তিনবার অগ্রাধিকার দিয়ে পরে বাবার কথা বলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় ইসলামে নারীর মর্যাদা কত উচ্চে প্রতিষ্ঠিত।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সভ্যতা বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদানকেও ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজও বিশ্বের বহু স্থানে নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি অনেক মুসলিম সমাজেও নারীর অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
১৯১১ সাল থেকে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশে নারী অধিকার স্মরণে বিশেষ দিবস উদযাপন শুরু হয়। ফলে অনেকের ধারণা, নারী অধিকার বুঝি আধুনিক কোনো ধারণা এবং পশ্চিমা বিশ্বই প্রথম নারীদের অধিকার দিয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, আজ থেকে প্রায় ১৪শ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নারীর বহু মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে ইসলামে নারীর কয়েকটি মৌলিক অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য :
১। জ্ঞান অর্জনের অধিকার
নবীজী (সা.) জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরজ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ নারীকে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত রাখার কোনো সুযোগ নেই। মসজিদে নববীতে নবীজী (সা.) যখন শিক্ষা দিতেন, তখন পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সে আলোচনায় অংশ নিতেন।
২। বিয়ের ক্ষেত্রে সম্মতির অধিকার
ইসলামে কোনো নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। বিয়েতে নারীর সম্মতি অপরিহার্য।
৩। কর্মজীবনের অধিকার
ইসলাম নারীকে কর্মজীবনে অংশগ্রহণের অধিকার দিয়েছে। নবীযুগে নারী সাহাবিরা যুদ্ধক্ষেত্রে সেবা, চিকিৎসা ও বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
৪। নিজ উপার্জনের ওপর অধিকার।
নারী তার উপার্জিত অর্থের পূর্ণ মালিক। সে অর্থে অন্য কারও অধিকার নেই, যদি না সে নিজে স্বেচ্ছায় তা দেয়।
৫। স্বামীর উপার্জনের ওপর অধিকার।
ইসলামে স্বামীকে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্ত্রী কর্মজীবী হলেও এই দায়িত্ব স্বামীর ওপরই বর্তায়।
৬। উত্তরাধিকার।
ইসলাম নারীদের উত্তরাধিকার অধিকার দিয়েছে। কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারীর অধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
৭। পিতৃপরিচয় সংরক্ষণের অধিকার।
বিয়ের পরও নারী তার নিজ পিতৃপরিচয় বহাল রাখতে পারে। এটি ইসলামে স্বীকৃত একটি অধিকার।
৮। সন্তানের সেবা পাওয়ার অগ্রাধিকার।
সন্তানের কাছে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
৯। স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার।
হাদিসে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।”
১০। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে মত প্রকাশের অধিকার।
ইসলামে নারীর খোলা বা বিচ্ছেদের অধিকার রয়েছে। ইতিহাসে বারিরা (রা.)-এর ঘটনাটি এর উজ্জ্বল উদাহরণ।
সবশেষে বলা যায়, ইসলাম নারীকে শুধু অধিকারই দেয়নি, দিয়েছে মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্মান। কিন্তু এই আদর্শ বাস্তব সমাজে প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়-নারীর প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।