২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মতামত
সম্পাদকীয়

সুশাসন চাইলে আগে সুনাগরিক হতে হবে

সুশাসন চাইলে আগে সুনাগরিক হতে হবে

একটি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি আজ সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে। নাগরিকরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়-সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজস্ব ভূমিকা কতটা?

রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকা যায় না। কারণ সুশাসন কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয়; এটি সরকার ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, আইন মানার সংস্কৃতি এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।

আইন মানার সংস্কৃতি কেন জরুরি :

ট্রাফিক আইন এর একটি সহজ উদাহরণ। সড়কে চলাচলের নিয়ম শুধু জরিমানা আদায়ের জন্য প্রণয়ন করা হয়নি; এর মূল উদ্দেশ্য মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই ট্রাফিক আইনকে বাধা হিসেবে বিবেচনা করেন। কেউ নম্বরপ্লেট আড়াল করেন, কেউ অবৈধভাবে যানবাহন চালান, আবার কেউ বিভিন্ন কৌশলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়ানোর চেষ্টা করেন।

এসব আচরণ শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধেরও ঘাটতি প্রকাশ করে। একদিকে আমরা আইনের দুর্বল প্রয়োগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির সমালোচনা করি, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আইন ভাঙতেও দ্বিধা করি না। এই দ্বৈত মানসিকতা একটি সুস্থ, সভ্য ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা।

যে সমাজে নাগরিকরা নিজেরাই আইনকে সম্মান করেন না, সেখানে শুধু কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

পরিবর্তনের শুরু নিজের ভেতর থেকে :

প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা হয় ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে। একজন নাগরিক যখন স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন এবং নিজের সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন, তখনই একটি ইতিবাচক সংস্কৃতির জন্ম হয়। সেই সংস্কৃতি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

সুনাগরিক হওয়া মানে শুধু ভোট প্রদান বা কর পরিশোধ করা নয়। এর অর্থ হলো জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া, সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা এবং দেশের আইন ও বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। একজন সচেতন নাগরিক জানেন, ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আইন ভঙ্গ করা শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আজ আমাদের প্রয়োজন আইনভীতি নয়, আইন মানার সংস্কৃতি। প্রয়োজন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা নয়, বরং দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতা। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কেবল সরকারের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না; এটি নাগরিকদের সচেতনতা, নৈতিকতা এবং আচরণের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একজন সুনাগরিকের তিনটি প্রধান গুণ হলো-বুদ্ধি, বিবেক এবং আত্মসংযম। এই তিন গুণই তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে এবং সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করে।

ইসলামের আলোকে সুনাগরিকের বৈশিষ্ট্য :

ইসলামে একটি রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। যারা এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তারাই প্রকৃত অর্থে সুনাগরিক। ইসলামের আলোকে একজন আদর্শ নাগরিকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো।

দেশপ্রেমিক হওয়া জরুরি :

মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ সুনাগরিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও তাঁর জন্মভূমিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। পবিত্র মক্কা থেকে হিজরতের সময় তিনি বলেছিলেন,

‘ভূখণ্ড হিসেবে তুমি কতই না উত্তম, আমার কাছে তুমি কতই না প্রিয়। যদি আমার স্বজাতি আমাকে বের করে না দিত, তবে কিছুতেই আমি অন্যত্র বসবাস করতাম না।’
(তিরমিজি: ৩৯২৬)

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করা :

কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, এমন যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত আইন মেনে চলা একজন নাগরিকের কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নির্দেশ পালন করো আল্লাহ, রাসুল এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী।’ (সুরা নিসা: ৫৯)

তবে কোনো শাসক যদি আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেন, তাহলে তার অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত অপরিহার্য, যতক্ষণ সে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ না করে। (সহিহ বুখারি: ২৯৫৫)

রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা :

রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে সচেতন থাকা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বিশেষ করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সীমান্ত রক্ষার ব্যাপারে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হজরত সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত থাকে, তার জন্য এক মাস সিয়াম পালন ও রাত জেগে ইবাদত করার সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে। সে মৃত্যুবরণ করলেও তার এ আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে।’ (নাসায়ি: ৩১৬৮)

বিশৃঙ্খলা থেকে দূরে থাকা :

একজন সুনাগরিক কখনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন না এবং কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে তাকে সহযোগিতাও করেন না। কারণ ইসলাম সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) হত্যার চেয়েও গুরুতর।’ (সুরা বাকারা: ১৯১)

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা :

ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। এই গুণই একটি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে, অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১১০)

সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করা :

সুনাগরিকের অন্যতম পরিচয় হলো বিনয়, নম্রতা ও সদাচার। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা অহংকারে নয়, বরং উত্তম আচরণে নিহিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং মাতাপিতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট ও দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও অধীনস্থদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না।’ (সুরা নিসা: ৩৬)

ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা :

ইসলাম পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। সমাজে ঐক্য ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা একজন সুনাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজরাত: ১০)

অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া :

একজন সত্যিকারের মুমিন ও সুনাগরিক কখনো অন্যের দুঃখ-কষ্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন না। সমাজের একজন মানুষের কষ্ট পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত মুসলমান একটি দেহের ন্যায়; যদি তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়, তবে পুরো শরীর তার প্রভাব অনুভব করে।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৭৫৪)

অভাবীর পাশে দাঁড়ানো :

সমাজের অসহায় ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক নিজের স্বার্থের পাশাপাশি সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকেন।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।’ (আদাবুল মুফরাদ: ১১২)

সুশাসন কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন বা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে সচেতন, দায়িত্বশীল এবং নৈতিক নাগরিকদের মাধ্যমে। আইন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, সামাজিক দায়িত্ব পালন করা এবং ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে সচেতন থাকা একজন সুনাগরিকের পরিচয়।

আজ তাই সুশাসনের দাবি তোলার পাশাপাশি নিজেদেরও আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি জবাবদিহিমূলক, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মিত হয় নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ, নৈতিকতা এবং সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

সুতরাং, সুশাসন চাইলে আগে সুনাগরিক হতে হবে। কারণ সুশাসনের প্রকৃত শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং সচেতন, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকের মধ্যেই নিহিত।

লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা

Home R3