আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্
পৃথিবীর সকল সচেতন মানুষের কাছে পরিচিত কিছু নাম ইতিহাসে চিরঅম্লান হয়ে আছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি নাম হলো ফেরাউন। কারও দৃষ্টিতে ফেরাউন ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক, আবার কারও কাছে তিনি নিষ্ঠুর, জুলুমবাজ ও অত্যাচারী স্বৈরশাসকের প্রতীক। তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে ফেরাউনদের শাসনামলে মিশরে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত ও বিস্ময়কর সভ্যতা। আকাশচুম্বী পিরামিড, সমৃদ্ধ শিল্পকলা, সুচারু স্থাপত্য এবং তাওহীদবিমুখ জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার সেই সময়েই বিকশিত হয়েছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা, বিলাসী জীবনধারা ও কীর্তিকর্ম আজও ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কৌতূহল, বিস্ময় ও ভাবনার খোরাক হয়ে আছে।
প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ফারাও বা ফেরাউনদের বর্ণনা। শুধু ইতিহাস গ্রন্থেই নয়, বরং ধর্মীয় গ্রন্থসমূহেও তাদের অবাধ্যতা, দাম্ভিকতা, অহংকার ও সীমালঙ্ঘনের কাহিনি গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
এই বিপুল আলোচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য থেকে, বইয়ের শিরোনামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমি সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।
প্রায় তিন হাজার বছরের দীর্ঘ রাজত্বকাল জুড়ে।প্রথম ফেরাউন নারমার বা মেনেস থেকে শুরু করে শেষ শাসক রানী ক্লিওপেট্রা সপ্তম পর্যন্ত—ফেরাউনশাসিত মিশরের ভূখণ্ডে মহান আল্লাহ তাআলা একাধিক নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন নবী ইউসুফ (আঃ) ও নবী মুসা (আঃ), যাঁদের জীবনের ঘটনাবলি ফেরাউনদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
একাধিকবার মিশর সফরের সৌভাগ্য হওয়ার কারণে, ফেরাউনদের জীবনধারা ও শাসনব্যবস্থাকে তুলে ধরতে মিশরীয় সরকারের উদ্যোগে নির্মিত কৃত্রিম গ্রাম পরিদর্শনের সুযোগ আমার হয়েছে। সেখানে ঘুরে এসে আমার কাছে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে যে, ফেরাউন বা ফারাওদের ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের ধারণা এখনও অস্পষ্ট ও খণ্ডিত। এই উপলব্ধি থেকেই, বিষয়টি সহজ ও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে, প্রথমেই ফেরাউনদের নাম ও তাঁদের শাসনকালীন সময় সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত নোট আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
প্রাচীন মিশর ও ফেরাউনদের রাজত্ব:
উত্তরে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে নুবিয়া (বর্তমান সুদান), পূর্বে সিনাই উপদ্বীপ ও লোহিত সাগর, আর পশ্চিমে লিবিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমি—এই বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল ফেরাউনদের রাজ্য। তবে প্রাচীন মিশরের ফেরাউনরা মূলত নাইল নদীকে কেন্দ্র করেই তাদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। রাজ্যের পরিধি বিস্তারের সেরা সময় ছিল নতুন সাম্রাজ্য New Kingdom যুগ। ফেরাউনদের দীর্ঘ রাজত্বকালকে ইতিহাসবিদরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে ভাগ করেছেন।
প্রারম্ভিক রাজবংশীয় যুগ Early Dynastic Period
(খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০–২৬৮৬)এই যুগের প্রথম ফেরাউন ছিলেন নারমার (মেনেস)। তাঁর হাত ধরেই উচ্চ ও নিম্ন মিশরের ঐক্য স্থাপিত হয়।
প্রাচীন সাম্রাজ্য Old Kingdom”পিরামিডের যুগ”
(খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬–২১৮১)এই সময়ে পিরামিড নির্মাণের সূচনা হয়। বর্তমান মিশরের জাদুঘরের তথ্যমতে এই যুগের বিখ্যাত ফেরাউনদের মধ্যে ছিলেন জোসের, খুফু ও খাফরে।
মধ্য সাম্রাজ্য Middle Kingdom হচ্ছে ((খ্রিস্টপূর্ব ২০৫৫–১৬৫০)এই যুগে মেনতুহোটেপ ও সেনুসরেত–এর মতো শক্তিশালী প্রশাসক ও যোদ্ধা রাজারা শাসন করেন। এই সময়কালেই নবী ইউসুফ (আ.) মিশরের ‘আজিজ’ (অর্থমন্ত্রী/মন্ত্রী) নিযুক্ত হন।
নতুন সাম্রাজ্য New Kingdom (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০–১০৬৯)
এটি ছিল মিশরের সবচেয়ে গৌরবময় যুগ। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ফেরাউনরা হলেন আহমোস, হাটশেপসুত, আখেনাতেন (যিনি একেশ্বরবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন)
এরপর সমাধির জন্য বিখ্যাত তুতানখামুন। তারপরের জন হলেন যিনি দীর্ঘ শাসন,জুলুম, যুদ্ধ ও বিশাল স্থাপত্যকর্ম বিশেষ করে নবী মূসা (আ.) এর সাথে বেয়াদবী ও অবাধ্যতার জন্য প্রসিদ্ধ রামেসিস দ্বিতীয়। ফেরাউন বলতে মানুষ তাকেই বুঝে থাকে। তার সাথে নবী মূসা (আ.)–এর ঘটনা নিয়ে আলাদা করে তুলে ধরবো।
ফেরাউন শাসনের অবসান মানে মিশরের শেষ স্বদেশি ফেরাউন যার পরে আর কোন মিশরীয় ফেরাউন ছিলেননা। তিনি হলেন নেখতানেবো (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৬৬৪–৩৩২)। সর্বশেষ শেষ ফেরাউন ক্লিওপেট্রা সপ্তম যিনি গ্রিক ও রোমানদের সমর্থনে ফেরাউন হন। এবং চুড়ান্ত ভাবে রোমান সম্রাট অগাস্টাস মিশর দখল করলে ফেরাউন শাসনের অবসান।
হযরত মুসা (আ.) এর জন্ম ও বেড়ে উঠা :
হযরত মুসা (আঃ)-এর সঙ্গে রামেসিস দ্বিতীয় ও তার পুত্র মেরনেপতাহকে ঘিরে যে সকল ঘটনা পবিত্র কুরআন ও অন্যান্য গ্রন্থে পাওয়া যায়, তাতে একথা স্পষ্ট যে সে ছিল চরম অহংকারী ও নিষ্ঠুর জালিম শাসক। আমি হযরত মুসা (আঃ)-এর জন্মের সময় ক্ষমতায় থাকা ‘কাবউস’ নামক ফেরাউনের স্বপ্ন এবং সেই সময়কার শিশু হত্যা-তাণ্ডব এবং মুসা আঃ এর নিরাপত্তা নিয়ে একটি ছোট্ট নোট উপস্থাপন করছি, ফেরাউন (কাবুস) স্বপ্ন দেখলেন যে মিশরের বাইরে থেকে একটি আগুন এগিয়ে আসছে, যা তাকে ক্ষতি করবে, কিন্তু বনি-ইসরাইলদের কোনো ক্ষতি করবে না। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী হতে পারে।তা নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরে তিনি জানতে পারলেন যে, বনি-ইসরাইলদের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া একটি ছেলে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে। সাথে সাথেই ফেরাউন ঘোষণা করলেন—বনি-ইসরাইলদের ঘরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ছেলে শিশুকে হত্যা করতে হবে এবং মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে হযরত মুসা (আঃ)-এর মা খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তখন
আল্লাহ তাঁর অন্তরে ওহী পাঠালেন, “তুমি তাকে দুধ পান করাও। যখন তার জন্য ভয় করবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করো; ভয় করো না, দুঃখ করো না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের একজন করব। (সূরা কাসাস: ৭)
মুসা (আঃ)-এর মা একটি ছোট ঝুড়িতে তাঁকে রেখে নীল নদে ভাসিয়ে দিলেন। আল্লাহর কুদরতে সেই ঝুড়ি ভেসে ভেসে গিয়ে পৌঁছে গেল ঠিক ফেরাউনের প্রাসাদের কাছে। সে সময় ফেরাউনের পরিবার শিশুটিকে দেখতে পায়, আর ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া (আঃ) নীল নদ থেকে শিশু মুসা (আঃ)-কে উদ্ধার করেন।
শিশুটিকে দেখে আসিয়া (আঃ) মুগ্ধ হয়ে ফেরাউনকে বললেন “এ শিশু আমার ও তোমার জন্য চোখের শীতলতা। একে হত্যা করো না। হয়তো সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।(সূরা কাসাস: ৯)
আসিয়ার (আঃ) এই কথায় ফেরাউন তাকে হত্যা করল না। শিশু মুসা (আঃ) যখন ক্ষুধায় কাঁদতে লাগলেন, তখন ফেরাউনের পরিবার বহু ধাত্রী এনে দুধ পান করানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তিনি কারও দুধই গ্রহণ করলেন না। তখন আল্লাহর ব্যবস্থায় তাঁর বোন প্রাসাদে গিয়ে বলল, সে এমন একজন নারীকে চেনে, যিনি এ শিশুকে দুধ পান করাতে পারবেন। আসলে সেই নারী ছিলেন মুসা (আঃ)-এর নিজের মা।
এভাবে মুসা (আঃ) আবার তাঁর মায়ের কাছেই ফিরে গেলেন.রাজকীয় নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে। এমন নিরাপত্তা ও রাজকীয় পরিবেশে সে সময় আর যে ব্যক্তি বেড়ে উঠেছিল, সে হলো কারূন। কারূনও ছিল বনি-ইসরাইলদের একজন। পরে সে অত্যন্ত ধনী হয়, কিন্তু অহংকার ও সীমালঙ্ঘনের কারণে আল্লাহ তাকে তার সম্পদসহ ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দেন।
আছিয়া (আঃ)-এর পরামর্শে ফেরাউন শিশু মুসা (আঃ)-কে রাজপ্রাসাদের রাজকীয় পরিবেশে লালন-পালন করার ব্যবস্থা করলেও তার হৃদয়ের গভীরে এক অদৃশ্য অশান্তি কাজ করছিল। তার দেখা সেই ভয়ংকর স্বপ্নের ব্যাখ্যা তাকে বারবার তাড়া করছিল।ইসরাইল বংশের এক শিশু তার রাজত্বের পতন ঘটাবে। এরইমধ্যে একদিন রাজসিংহাসনের পাশে বসে থাকা শিশু মুসা (আঃ) খেলতে খেলতে হঠাৎ ফেরাউনের কোলে উঠে পড়লেন। নিষ্পাপ কৌতূহলে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিলেন ফেরাউনের দাড়ির দিকে, আর টান দিলেন জোরে। ব্যথায় ও অপমানে ফেরাউনের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তার মনে হলো—এই শিশুই কি তবে সেই শত্রু, যার কথা স্বপ্নে আমাকে দেখানো হয়েছে?
ক্রোধ আর ভয়ের বশে সে সঙ্গে সঙ্গেই শিশুটিকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। কিন্তু দরবারের জ্ঞানীরা তাকে বলল, এ তো কেবলই এক অবুঝ শিশু। আপনি চাইলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
ফেরাউন আদেশ দিল—শিশুর সামনে দুইটি জিনিস রাখা হলো। এক পাশে জ্বলন্ত আগুন, অন্য পাশে ঝকঝকে হীরা কিংবা মিষ্টি খেজুর। ফেরাউন মনে মনে ভাবল, বুদ্ধিমান হলে সে দামী জিনিস নেবে, আর নিছক শিশু হলে আগুনের দিকেই হাত বাড়াবে। আল্লাহর অদৃশ্য হিফাযতে ঠিক সেটাই হলো। শিশু মুসা (আঃ) আগুনের দিকে হাত বাড়ালেন, আর মুখে দিতে গিয়েই জ্বলে উঠল আগুন। তাঁর জিহ্বা সামান্য পুড়ে গেল। শিশুটি কেঁদে উঠল, প্রাসাদ ভরে গেল শোরগোলে।
এই ঘটনায় ফেরাউন নিশ্চিত হলো,এ শিশু কোনো ষড়যন্ত্রকারী নয়, নিছকই এক নিষ্পাপ শিশু। সে তার হত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল। এই সামান্য দগ্ধতাই পরবর্তীতে মুসা (আঃ)-এর জিহ্বায় জড়তা সৃষ্টি করেছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।
বড় হওয়ার পরতো আরো বেশী ভয় ও সতর্ক থাকতো ফেরাউন, তার একটা নিদর্শন আমরা দেখতে পাই নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে, এক দুপুরের রোদে মিসরের শহরটা তখন নিস্তব্ধ। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। লোকেরা ঘরে, বিশ্রামে। ঠিক সেই নির্জন সময়ে মুসা (আ.) ধীরে ধীরে শহরে প্রবেশ করলেন। তিনি ঝগড়া করতে আসেননি, বিপ্লব করতে আসেননি।তিনি এসেছিলেন সাধারণ এক মানুষের মতো। কিন্তু হঠাৎ এক সরু গলির ভেতর থেকে ভেসে এলো চিৎকার। মুসা (আ.) এগিয়ে গেলেন। দেখলেন,দুজন মানুষ মারামারি করছে। একজন তাঁর নিজের জাতির বনী ইসরাইলের এক নির্যাতিত যুবক। আরেকজন কিবতী ফেরাউনের সম্প্রদায়ের লোক, শক্তিশালী ও উদ্ধত। কিবতী লোকটি বনী ইসরাইলিকে আছড়ে ফেলছে, অপমান করছে।
আর তখনই সেই মজলুম কণ্ঠে ডাক এলো; হে মুসা! আমাকে বাঁচান! এই নামটা শুধু একটি নাম ছিল না। এই নামটা ছিল এমন এক নাম, যেটা শুনলে ফেরাউনের বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা নড়ে উঠত। কারণ এই যুবককেই ঘিরে ছিল সেই পুরোনো স্বপ্ন, সেই ভবিষ্যদ্বাণী,যে বনী ইসরাইলের এক ছেলে তোমার রাজত্ব ধ্বংস করবে!ফেরাউন তাকে প্রাসাদে বড় করেছিল ঠিকই কিন্তু কখনোই মন থেকে ভরসা করতে পারেনি। মুসা (আ.)-এর শক্ত দৃষ্টি, ন্যায়ের প্রতি ঝোঁক, মানুষের ভালোবাসা, সবকিছুই ফেরাউনের মনে ভয়ের বীজ বুনে দিয়েছিল।৷ আর আজ, সেই মুসা নাম নিয়ে একজন নির্যাতিত মানুষ সাহায্য চাইছে। মুসা (আ.) এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি মজলুমকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলেন এবং কিবতী লোকটিকে একটি মাত্র ঘুষি মারলেন,হত্যা করার নিয়তে নয়, শুধু অন্যায় থামানোর জন্য। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায়,সেই এক আঘাতেই লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং মৃত্যু বরন করল।
নীরব গলিটা হঠাৎ আরও নীরব হয়ে গেল, মুসা(আ.) এর শরীর কেঁপে উঠল। তিনি হতভম্ব হয়ে মৃতদেহের দিকে তাকালেন। ভাঙা কণ্ঠে তিনি ফিসফিস করে বললেন- এটা শয়তানের কাজ-সে তো স্পষ্ট বিভ্রান্তকারী শত্রু। সেখানেই, সেই নীরব রাস্তায় দাঁড়িয়ে, তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে বললেন- হে আমার রব, আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আর রহমতের দরজা সাথে সাথেই খুলে গেল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন।
চোখ ভেজা অবস্থায় মুসা (আ.) বললেন, হে আমার রব, তুমি যে অনুগ্রহ আমাকে দিয়েছ, তার কসম! আমি আর কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না। কিন্তু ফেরাউনের প্রাসাদে তখন ভিন্ন আগুন জ্বলছিল।
যখন খবর পৌঁছাল- ফেরাউনের এক লোক মুসার হাতে মারা গেছে! ফেরাউন চুপ করে বসে রইল। এই মৃত্যু তাকে শুধু একজন লোক হারানোর কষ্ট দেয়নি, বরং তার ভেতরের পুরোনো ভয়কে জাগিয়ে তুলেছিল। এই সেই ছেলে-যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, যার হাত থেকে রাজত্ব বাঁচাতে গিয়ে আমি হাজারো শিশু হত্যা করেছিলাম,
রাজসিংহাসনের ভেতর বসে থাকা শক্তিশালী শাসক, সেই দিন বুঝে গিয়েছিল-মুসা আর শুধু প্রাসাদের সন্তান নয়।সে এমন এক আগুন,যাকে প্রাসাদের দেয়াল বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না। আর তাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মুসাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে ফেরাউন।
পরদিন শহরে গেলে আবার দেখলেন—সেই লোকই আরেকজনের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত। মুসা (আঃ) এগোতেই সে চিৎকার করে উঠল। বলল, হে মুসা! তুমি কি আজও কাউকে হত্যা করতে চাও, যেমন গতকাল করেছিলে?
ঠিক তখনই দূর থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এসে ফিসফিস করে বলল, হে মুসা! নেতারা তোমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখান থেকে চলে যাও। আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী।এই কথাটাই ছিল রাজপ্রাসাদের দরজায় শেষ আঘাত। এই ছিল বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি। একা, নিরস্ত্র—বাহন, সঙ্গী, খাবার, পানি ছাড়া শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে মিশর ছেড়ে বের হয়ে পড়লেন। শুধু হৃদয়ের গভীর থেকে দোয়া করলেন, হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর। দিনের পর দিন মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে পা পুড়ছে।
রাতের পর রাত আকাশের নিচে ক্ষুধা, ভয় আর অনিশ্চয়তা বুকে নিয়ে হাঁটছেন একা। জানেন না সামনে তাঁর জন্য কী রয়েছে। শুধু এটুকু জানতেন—তাঁর জন্য আল্লাহ আছেন। আর তিনিই যথেষ্ট। দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে তিনি পৌঁছালেন মাদায়েনে। একটি কূপের পাশে অনেক রাখাল তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছে। ভিড়ের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে দুই লজ্জাশীলা তরুণী-তাদের পশুগুলো তৃষ্ণায় কাতর, কিন্তু তারা পুরুষদের ভিড়ে ঢুকতে পারছে না।
মুসা (আঃ) এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,তোমরা কেন অপেক্ষা করছ? তারা শান্ত গলায় বলল,আমাদের বাবা খুব বৃদ্ধ। রাখালরা চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা পানি তুলতে পারি না। ক্ষুধায় দুর্বল, ক্লান্ত শরীর—তবুও মুসা (আঃ) এগিয়ে গেলেন। একাই পাথর সরিয়ে তাদের পশুগুলোকে পানি পান করালেন। এরপর তিনি এক পাশে ছায়ায় বসে পড়লেন।
আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করলেন, হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার জন্য যে কল্যাণই অবতীর্ণ করো না কেন, আমি তার মুখাপেক্ষী। এর কিছু সময়ের মধ্যে সেই নারীদের একজন লজ্জায় মাথা নিচু করে এসে বলল,আমাদের বাবা আপনাকে ডাকছেন। আপনি আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছেন, তার প্রতিদান দিতে চান। মুসা (আঃ) দাওয়াত কবুল করলেন। তাদের সঙ্গে বাড়িতে গেলেন এবং সব কথা খুলে বললেন।
বৃদ্ধ নেক বান্দা (হযরত শোয়াইব আঃ) সব শুনে বললেন,ভয় করো না। তুমি জালিম কওম থেকে মুক্ত হয়েছ।
এই কথাগুলো ছিল মুসা (আঃ)-এর ক্লান্ত হৃদয়ের ওপর রহমতের পরশ। তিনি সেখানে আশ্রয় পেলেন। কাজ পেলেন। সম্মান পেলেন।এবং একসময় সেই নেক মানুষের কন্যাকে বিবাহ করলেন। রাজপ্রাসাদে বেড়ে ওঠা সেই মুসা (আঃ) হয়ে উঠলেন এক মেষপালক।
আল্লাহ তাঁকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দিলেন।
চলবে…
লেখক : বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য