৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পর্তুগালে নব্য নাৎসি গোষ্ঠীর ৩৭ সদস্য গ্রেপ্তার

পর্তুগালে অভিবাসীদের লক্ষ্য করে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে নব্য নাৎসি মতাদর্শে বিশ্বাসী একটি সংগঠনের ৩৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। সম্প্রতি পর্তুগিজ বিচার বিভাগীয় পুলিশ এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করে।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) আটক ব্যক্তিদের লিসবনের আদালতে হাজির করা হয়। বিচারকরা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের নির্দেশ দেন।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, যারা দীর্ঘদিন ধরে নব্য নাৎসি, বর্ণবাদী ও বিদেশিবিদ্বেষী মতাদর্শ প্রচার করে আসছিল। একই সঙ্গে তারা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ঘৃণাজনিত অপরাধে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্তুগালজুড়ে পরিচালিত এই বড় অভিযানে অন্তত ৩০০ পুলিশ সদস্য অংশ নেন। অভিযানের সময় রাজধানী লিসবনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ৬৫টি স্থানে একযোগে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিতে কট্টর ডানপন্থি প্রচারণার নানা উপকরণ, নাৎসি প্রতীক, ঘৃণামূলক লিফলেট ও পোস্টার ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়, আটক ব্যক্তিরা বৈষম্য, ঘৃণা ও সহিংসতায় উসকানি, গুরুতর হুমকি, জবরদস্তি এবং শারীরিক সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িত একটি সংগঠিত অপরাধী চক্রের সদস্য।

গ্রেপ্তারদের বয়স ৩০ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে আগেও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘৃণামূলক ও কট্টর ডানপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে ৩৭ জনের মধ্যে ১৫ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

তদন্তে বলা হয়, এই গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে অভিবাসীরা। তারা অভিবাসীদের ভয় দেখানো, নিপীড়ন করা এবং সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বর্ণবাদী ও বিদেশিবিদ্বেষী বার্তার সঙ্গে সরাসরি রাস্তার সহিংস কর্মকাণ্ডের যোগসূত্রও পেয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশ, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অভিবাসীরা।

এই গোষ্ঠীর সঙ্গে পর্তুগালের পরিচিত নব্য নাৎসি নেতা মারিও মাচাদোর যোগসূত্র থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। মারিও মাচাদো বর্তমানে কারাগারে থাকলেও বাইরে থাকা অনুসারীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাচাদো ‘গ্রুপো ১১৪৩’ নামের একটি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ফরাসি দৈনিক লিবেরাসিওঁ ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, এই গোষ্ঠী প্রয়োজনে নিজেদের “আধাসামরিক সংগঠন” হিসেবে রূপান্তরের প্রস্তুতিও রাখে। তাদের দাবি, কথিত গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে তারা “পর্তুগিজদের রক্ষা” করবে।

পর্তুগাল সিএনএনের বরাতে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে গ্রুপো ১১৪৩–এর কয়েকজন সদস্য একটি পেট্রল স্টেশনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক অভিবাসীকে আক্রমণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কফি খেতে থামার পর প্রায় দশজন তাকে ঘিরে ধরে মারধর করে। গুরুতর আহত ওই ব্যক্তি রাতটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাটান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্তুগালে বিদেশি জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা বহু শ্রমিক দেশটিতে বসতি গড়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ পর্তুগালে বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ।

এদিকে একই সময়ে দেশটিতে কট্টর ডানপন্থার রাজনৈতিক উত্থানও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় কট্টর ডান দল শেগার প্রার্থী আন্দ্রে ভেনচুরা ২৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় দফায় জায়গা করে নেন। সমাজতান্ত্রিক প্রার্থী আন্তোনিও জোসে সেগুরো পেয়েছেন ৩১ শতাংশ ভোট।

লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পাউলা এসপিরিতো সান্তো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, প্রথম দফায় শীর্ষে না থাকলেও এটি ভেনচুরার জন্য একটি বড় বিজয়। তার ভাষায়, ভেনচুরা ঐতিহ্যবাহী ডান দলগুলোকে ছাড়িয়ে বিরোধী রাজনীতির নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনের জন্য এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ভেনচুরার কাছে একটি “সাফল্যের মঞ্চ” হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী হওয়া।